হার্টবিট ডেস্ক
দেশের সরকারি হাসপাতালে প্রথমবারের মতো গর্ভস্থ শিশুর শরীরে সফলভাবে রক্ত সঞ্চালন (ইনট্রা ইউটেরিন ফিটাল ব্লাড ট্রান্সফিউশন বা আইইউটি) করা হয়েছে। মঙ্গলবার (৩০ জুন) রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মা ও গর্ভস্থ শিশুর বিশেষায়িত চিকিৎসা ইউনিটে এই জটিল ও জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা সফলভাবে সম্পন্ন হয়।
এই চিকিৎসা কার্যক্রমে নেতৃত্ব দেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফিটো ম্যাটার্নাল মেডিসিন ইউনিটের প্রধান ডা. খন্দকার শেহনীলা তাসমিন। তার সঙ্গে ছিলেন প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সুলতানা আফরোজ, অধ্যাপক ডা. ইসরাত জাহান ও অধ্যাপক ডা. খালেদুন্নেসা। এ ছাড়া শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. আইনুল ইসলাম খান, এনেস্থেসিয়া বিভাগের অধ্যাপক ডা. রেহান উদ্দিন খান, ডা. নোমান, ডা. শরীফ, রক্ত সঞ্চালন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সহকারী অধ্যাপক ডা. হাবিবুর রহমান এবং হেমাটোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ডা. মির্জা গোলাম সারওয়ার চিকিৎসাটি সফলভাবে সম্পন্ন করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
ডা. খন্দকার শেহনীলা তাসমিন বলেন, রক্তের গ্রুপজনিত জটিলতার কারণে গর্ভস্থ শিশুর শরীরে মারাত্মক রক্তস্বল্পতা দেখা দিলে তার জীবন রক্ষায় গর্ভের ভেতরে ভ্রূণের শরীরে রক্ত সঞ্চালন (আইইউটি) করা হয়। আল্ট্রাসাউন্ডের সহায়তায় গর্ভের ভেতরে শিশুর নাভির রক্তনালীতে নিরাপদভাবে রক্ত সঞ্চালনের মাধ্যমে চিকিৎসাটি সম্পন্ন করা হয়।
তিনি বলেন, গর্ভস্থ শিশুর শরীরে রক্ত সঞ্চালন অত্যন্ত আধুনিক ও বিশেষায়িত চিকিৎসাপদ্ধতি। মা ও গর্ভস্থ শিশুর রেসাস (আরএইচ) রক্তের গ্রুপের অসামঞ্জস্য, তীব্র রক্তস্বল্পতা, শরীরে অস্বাভাবিকভাবে পানি জমে যাওয়া কিংবা অন্যান্য জটিলতায় গর্ভের শিশুর জীবন ঝুঁকির মুখে পড়লে এই চিকিৎসা দেওয়া হয়। সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে গর্ভস্থ শিশুর মৃত্যুঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হয় এবং নিরাপদভাবে গর্ভকাল আরও কিছুদিন বাড়ানো যায়।
তিনি আরও জানান, চিকিৎসা পাওয়া রোগীর ক্ষেত্রে মায়ের রক্তের গ্রুপ ছিল আরএইচ নেগেটিভ এবং বাবার রক্তের গ্রুপ আরএইচ পজিটিভ। ফলে গর্ভস্থ শিশুর রক্তের গ্রুপ বাবার মতো আরএইচ পজিটিভ হওয়ায় মায়ের শরীরে তৈরি হওয়া প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি শিশুর লোহিত রক্তকণিকা ধ্বংস করতে শুরু করে। এতে শিশুর হিমোগ্লোবিন দ্রুত কমে গিয়ে গুরুতর ভ্রূণজনিত রক্তস্বল্পতা দেখা দেয়।
তিনি বলেন, রোগীর অবস্থা মূল্যায়নের পর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে বোর্ড সভা করে এই চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর বিশেষভাবে প্রস্তুত ও উচ্চমানের পরীক্ষার মাধ্যমে নিরাপদ রক্ত সংগ্রহ করা হয়। আল্ট্রাসাউন্ডের সহায়তায় গর্ভস্থ শিশুর নাভির শিরায় রক্ত সঞ্চালন করা হয়। চিকিৎসা সফল হওয়ার পর ধীরে ধীরে শিশুর নড়াচড়া স্বাভাবিক হয়ে আসে। বর্তমানে মা ও গর্ভস্থ শিশু দুজনই সুস্থ আছেন।
ডা. শেহনীলা তাসমিন বলেন, সাধারণত প্রথম গর্ভধারণে এ ধরনের জটিলতা কম দেখা যায়। তবে প্রথম সন্তান যদি আরএইচ পজিটিভ হয়, তাহলে মায়ের শরীরে ওই রক্তের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি তৈরি হতে পারে। পরবর্তী গর্ভধারণে গর্ভস্থ শিশুও আরএইচ পজিটিভ হলে সেই অ্যান্টিবডি শিশুর লোহিত রক্তকণিকা ধ্বংস করে গুরুতর জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
তিনি বলেন, এই জটিলতা প্রতিরোধে প্রথম সন্তান জন্মের পর কিংবা গর্ভপাত, জরায়ুর বাইরে গর্ভধারণ অথবা গর্ভাবস্থায় রক্তক্ষরণের মতো ঘটনায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অ্যান্টি ডি প্রতিরোধী ইনজেকশন দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে মায়ের শরীরে ক্ষতিকর অ্যান্টিবডি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি কমে যায় এবং পরবর্তী গর্ভধারণে শিশুকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হয়।
তিনি আরও বলেন, উন্নত দেশগুলোতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা কার্যকরভাবে অনুসরণ করায় এ ধরনের জটিলতা তুলনামূলক কম দেখা যায়। তবে বাংলাদেশে এখনও প্রতিবছর প্রায় ৮ থেকে ১০ জন রোগী এ ধরনের জটিলতা নিয়ে আসেন। গর্ভাবস্থাতেই তাদের যথাসময়ে শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিতে পারলে অনেক গর্ভস্থ শিশুর জীবন রক্ষা করা সম্ভব।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, এই সাফল্যের মাধ্যমে ভবিষ্যতে রক্তের গ্রুপজনিত জটিলতাসহ গর্ভস্থ শিশুর বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত গর্ভবতী নারীরা দেশের সরকারি হাসপাতালেই উন্নতমানের বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা পাবেন। একই সঙ্গে জন্মের আগেই রোগ নির্ণয় ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা আরও সম্প্রসারণের মাধ্যমে মা ও অনাগত শিশুর সর্বোচ্চ মানের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে কাজ করে যাবে হাসপাতালটি।






Discussion about this post