হাঁটু প্রতিস্থাপনের সার্জারি— যা হাঁটুর আর্থোপ্লাস্টি নামেও পরিচিত, করালে গুরুতর অসুস্থ হাঁটুর ব্যথা থেকে আরাম পাওয়া যেতে পারে এবং হাঁটু আবার আগের মতো সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। এই প্রসিডিওর বা চিকিৎসা পদ্ধতিতে আপনার উরুরহাড়, পায়ের হাড় ও হাঁটুর হাড়ে থাকা ক্ষতিগ্রস্ত হাড় ও তরুণাস্থিকে কেটে বের করে নিয়ে তার জায়গায় সংকর ধাতু, উচ্চ গ্রেডের প্লাস্টিক ও পলিমার দিয়ে তৈরি কৃত্রিম অস্থি সন্ধি (প্রোস্থেসিস) বসিয়ে দেওয়া হয়।
হাঁটু প্রতিস্থাপন করাটা আপনার পক্ষে ঠিক হবে কি না তা বোঝার জন্য অস্থি রোগ বিশেষজ্ঞ সার্জন আপনার হাঁটুর গতিশীলতা, স্থায়িত্ব ও জোর কতখানি আছে তা পরীক্ষা করে দেখবেন। কতখানি ক্ষতি হয়েছে তা জানতে সাহায্য করে এক্স-রে।
আপনার বয়স, ওজন, কাজকর্ম করার মাত্রা, হাঁটুর আকার ও আকৃতি ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে বিভিন্ন ধরনের হাঁটু প্রতিস্থাপনের প্রোস্থেসিস ও সার্জিক্যালটেকনিকের মধ্যে থেকে পছন্দ মতো প্রোস্থেসিস ও টেকনিক বেছে নিতে পারেন।
কেন এটা করা হয়
আর্থারাইটিস বা বাত মানে হল গাঁটের ব্যথা। হাড়ের প্রান্তগুলো আস্তে আস্তে ক্ষয়ে যাওয়ার ফলে গাঁটগুলোর মধ্যবর্তী ফাঁকা জায়গাগুলো ছোট হয়ে আসে, এই ভাবে হাড়ের উপর ঘর্ষণের সৃষ্টি হয়, তখন হাড়ের গতিশীলতার পরিবর্তন হয়ে খুব ব্যথা হতে থাকে। এই অবস্থার চিকিৎসার জন্য সবচেয়ে ভাল উপায় হল হাঁটু প্রতিস্থাপনের সার্জারি এবং এটা করালে হাঁটুরও স্বাভাবিক ক্রিয়াকলাপের ক্ষমতা ফিরে আসে।


কী ভাবে প্রস্তুতি নেবেন
চিকিৎসা পদ্ধতি বা প্রসিডিওরের আগে
হাঁটু প্রতিস্থাপনের সার্জারির জন্য অ্যানেস্থেসিয়ার প্রয়োজন হয়। আপনার নিজের মত ও পছন্দের কথা জানতে পারলে টিমের এই সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হবে যে জেনারেল অ্যানেস্থেসিয়াকরা হবে না কি স্পাইনালঅ্যানেস্থেসিয়া করা হবে। প্রথমটায় আপনি অচেতন হয়ে পড়বেন এবং পরেরটায় আপনি জেগে থাকবেন কিন্তু কোমরের নীচে কোনও ব্যথা অনুভব করতে পারবেন না।
সার্জারির পরে যাতে কোনও সংক্রমণ না-হয় তার জন্য চিকিৎসা পদ্ধতি শুরু করার আগে, এই পদ্ধতি চলাকালীন এবং এর পরে আপনাকে ইন্ট্রাভেনাসঅ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হবে। আপনার হাঁটুকে অবশ করে দেওয়ার জন্য তার চারপাশে একটা নার্ভ ব্লকও দেওয়া হতে পারে।
চিকিৎসা পদ্ধতি চলাকালীন
গাঁটের সমস্ত পৃষ্ঠতল যাতে দেখা যায় তার জন্য আপনার হাঁটুকে বেঁকিয়ে রাখা হবে। প্রায় 6 থেকে 10 ইঞ্চি (15 থেকে 25 সেন্টিমিটার) ছেদ করার পর আপনার সার্জন আপনার হাঁটুর হাড়ের কাছে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত গাঁটের পৃষ্ঠতল কেটে বের করে দেবেন।
গাঁটের পৃষ্ঠতল তৈরি করার পর কৃত্রিম গাঁটের টুকরোগুলোকে জোড়া লাগাবেন সার্জন। ছেদ বন্ধ করার আগে তিনি আপনার হাঁটুকে বেঁকিয়ে ও ঘুরিয়ে দেখবেন যে হাঁটু ক্রিয়াকলাপ ঠিক ভাবে হচ্ছে কি না। এই সার্জারি প্রায় দুই ঘণ্টা চলবে।
চিকিৎসা পদ্ধতির পর
আপনাকে এক থেকে দুই ঘণ্টার জন্য রিকভারি রুমে নিয়ে যাওয়া হবে। তারপর সেখান থেকে আপনাকে নিয়ে যাওয়া হবে আপনার হাসপাতালের কক্ষে। সেখানে আপনাকে আরও দু দিন থাকতে হতে পারে। ডাক্তারের বলে দেওয়া ওষুধ খেলে ব্যথা কমবে।
আপনি যখন হাসপাতালে থাকবেন, তখন আপনাকে পায়ের পাতা ও গোড়ালিনড়াচড়া করার জন্য উৎসাহ দেওয়া হবে। এ রকম করলে আপনার পায়ের পেশিগুলোতেরক্তপ্রবাহবাড়বে। যার ফলে পা ফুলবে না এবং রক্তও জমাট বাঁধবে না। পা যাতে না-ফোলে এবং রক্ত জমাট না-বাঁধার জন্য আপনাকে ব্লাড থিনার দেওয়া হতে পারে, সাপোর্টহোস বা কমপ্রেশনবুটপরানো হতে পারে।
আপনাকে ঘন ঘন শ্বাসের ব্যায়াম করতে বলা হবে এবং আস্তে আস্তে আপনার কাজকর্ম করার মাত্রা বাড়াতে বলা হবে।
সার্জারির পরদিনই একজন ফিজিক্যালথেরাপিস্ট আপনাকে দেখিয়ে দেবে, কী ভাবে নতুন হাঁটু নিয়ে ব্যায়াম করতে হবে। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরে আপনাকে নিজের বাড়িতে বা কোনও সেন্টারে ফিজিক্যালথেরাপি চালিয়ে যেতে হবে।


আপনাকে বলে দেওয়া নিয়ম মেনে নিয়মিত ব্যায়াম করুন। সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য ক্ষতের পরিচর্যা, আহার ও ব্যায়াম সংক্রান্ত যেসব নিয়ম মেনে চলতে বলবে আপনার পরিচর্যাকারীটিম সেসব মেনে চলুন।
বেশির ভাগ লোকই হাঁটু প্রতিস্থাপনের পর ব্যাথা থেকে মুক্তি পান, তাঁরা আগের চেয়ে অনেক ভাল করে চলাফেরা করতে পারেন এবং তাঁদের জীবনযাত্রার মানও আগের চেয়ে ভাল হয়ে যায়। বেশির ভাগ হাঁটু প্রতিস্থাপনই 15 বছরের বেশি সময় ধরে থাকে।
সার্জারির হওয়ার তিন থেকে ছয় সপ্তাহ পরেই আপনি সাধারণ ভাবে নিজের বেশির ভাগ দৈনন্দিন কাজকর্ম যেমন বাজার করা ও ঘরদোর পরিষ্কার করার মতো হালকা কাজ করা ইত্যাদি করতে পারবেন। গাড়িতে বসার মতো করে আপনি নিজের হাঁটু মুড়তে পারলে, ব্রেক ও অ্যাক্সিলারেটর অপারেট করার জন্য পেশিগুলোকে যথেষ্ট পরিমাণে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে এবং আপনি যদি ব্যথা উপশমকারী নার্কোটিক ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দিয়ে থাকেন, তাহলে প্রায় তিন সপ্তাহ পরে গাড়িও চালাতে পারবেন।
সুস্থ হয়ে ওঠার পর আপনি কম চাপ পড়া বিভিন্ন ধরনের কাজ করতে পারেন। যেমন হাঁটা, সাঁতার কাটা, গল্ফ খেলা বা বাইক চালানো। কিন্তু বেশি চাপ পড়ার মতো কাজ করা বন্ধ করুন। যেমন জগিং, স্কি করা, টেনিস খেলা ও হাঁটু মুড়ে থাকা বা ঝাঁপাঝাঁপি করার মতো খেলাধুলো। আপনি কী কী করতে পারবেন না সে ব্যাপারে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে নিন।






Discussion about this post